হজ্জের বিবিধ মাসয়ালা

 

ইহরামকারী ব্যক্তির জন্য গোসল করা ও ইহরামের কাপড় পরিবর্তন করা কি জায়েয আছে?

 

 

আলহামদুলিল্লাহ।

মুহরিমের জন্য পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার উদ্দেশ্য গোসল করা জায়েয আছে। কেননা হাদিসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে সাব্যস্ত হয়েছে যে, তিনি ইহরাম অবস্থায় গোসল করেছেন। অনুরূপভাবে ইহরামের কাপড় পরিবর্তন করে অন্য অতিরিক্ত পরিস্কার বা নতুন কোন কাপড় পরিধান করা জায়েয। অনুরূপভাবে মুহরিমের জন্যে এসি বা আরামদায়ক অন্য কোন জিনিস ব্যবহার করার জায়েয।[সমাপ্ত]

[মাজমুউ ফাতাওয়া বিন উছাইমীন (২২/১৪৪)

 

 

কোরবানীর দিনের ফযিলত

 

 

আলহামদুলিল্লাহ।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মদিনায় আগমন করলেন তখন মদিনাবাসীরা বিশেষ দুইটি দিন খেল-তামাশা করত। তিনি বললেন: আল্লাহ এ দুই দিনের বদলে তোমাদেরকে উত্তম দুইটি দিন দিয়েছেন: ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা।[সুনানে আবু দাউদ (১১৩৪), আলবানী ‘সিলসিলা সহিহা’ গ্রন্থে (২০২১) হদিসটিকে সহিহ বলেছেন]

তাই আল্লাহ এ উম্মতকে খেল-তামাশার দুইটি দিনের পরিবর্তে আল্লাহর যিকির, শুকর, ক্ষমা ও গুনাহ মাফের দুইটি দিন দিয়েছেন।

তাই দুনিয়াতে মুমিনের জন্য তিনটি ঈদ রয়েছে:

একটি ঈদ প্রতি সপ্তাহে আবর্তিত হয়। অপর দুইটি ঈদ প্রতিবছর একবার একবার করে আসে; একবারের বেশি আসে না।

প্রতি সপ্তাহে যে ঈদটি আবর্তিত হয় সেটি হচ্ছে- জুমাবার। আর যে ঈদদ্বয় বছরে একবারের বেশি আসে না; বরং প্রতিবছর শুধু একবার আসে সে ঈদদ্বয়ের একটি হচ্ছে- ঈদুল ফিতর তথা রমযানের রোযা ভাঙ্গাকেন্দ্রিক উৎসব। এটি রমযানের রোযা পূর্ণ করার সাথে সম্পৃক্ত। যে রোযা হচ্ছে ইসলামের তৃতীয় স্তম্ভ। মুসলমানেরা তাদের ফরয রোযার মাস পূর্ণ করার পর, রোযা সম্পন্ন করার পর আল্লাহ তাদের জন্য ঈদ উদযাপন করা বিধান দিয়েছেন; যে উৎসবে তারা আল্লাহর শুকর, তাঁর যিকির ও তাকবীর দিতে দিতে আল্লাহর হেদায়েতের আলোকে একত্রিত হয়। এ উৎসবের দিন আল্লাহ তাদের জন্য নামায ও সদকা করার বিধান দিয়েছেন।

দ্বিতীয় ঈদ হচ্ছে- যিলহজ্জ মাসের দশ তারিখে কোরবানীর ঈদ। এটি দুই ঈদের মধ্যে সর্বোত্তম ও মহান। এ ঈদ হজ্জ সম্পন্ন করার পর দেয়া হয়েছে। যখন মুসলমানেরা হজ্জ শেষ করে তখন আল্লাহ তাদের ক্ষমা করে দেন।

আরাফার দিন আরাফা মাঠে অবস্থান করার মাধ্যমে হজ্জ পূর্ণতা লাভ করে। আরাফাতে অবস্থান হচ্ছে- হজ্জের সবচেয়ে মহান রুকন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “হজ্জ হচ্ছে- আরাফা”[সুনানে তিরমিযি (৮৮৯), আলবানী ‘ইরওয়াউল গালিল’ গ্রন্থে (১০৬৪) হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন]

আরাফার দিন জাহান্নাম থেকে মুক্তির দিন। এ দিনে যেসব মুসলমান আরাফাতে অবস্থান করে কিংবা আরাফাতে অবস্থান করে না; আল্লাহ তাআলা উভয় ধরণের মানুষকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্ত করেন। এ কারণে আরাফার দিনের পরের দিন সর্বস্থানের সকল মুসলমানের জন্য ঈদের দিন; যারা হজব্রত আদায়ের জন্য হাযির হতে পেরেছে কিংবা হাযির হতে পারেনি।

 

 

এ দিনে নুসুকের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য হাসিলের বিধান সকলের জন্য দেয়া হয়েছে। নুসুক হচ্ছে- কোরবানীর পশুর রক্তপাত করা। কোরবানীর দিনের সংক্ষিপ্ত ফযিলত নিম্নরূপ:

১। আল্লাহর কাছে এটি একটি উত্তম দিন:

ইবনুল কাইয়্যেম (রহঃ) ‘যাদুল মাআদ’ গ্রন্থে (১/৫৪) বলেন: “আল্লাহর কাছে সর্বোত্তম দিন হচ্ছে- কোরবানীর দিন। এটি হচ্ছে- বড় হজ্জের দিন। যেমনটি বর্ণিত হয়েছে সুনানে আবু দাউদ গ্রন্থে (১৭৬৫) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে তিনি বলেন: আল্লাহর কাছে সবচেয়ে মহান দিন হচ্ছে- কোরবানীর দিন।[আলবানী সহিহ আবু দাউদ গ্রন্থে হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন]

২। এটি হচ্ছে বড় হজ্জের দিন:

ইবনে উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: যে বছর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হজ্জ আদায় করেন সে বছর কোরবানীর দিন তিনি জমরাতগুলোর মাঝখানে দণ্ডায়মান হয়ে বলেন, আজ বড় হজ্জের দিন”[সহিহ বুখারী (১৭৪২)]

বড় হজ্জ আখ্যায়িত করার কারণ হল: হজ্জের অধিকাংশ আমল এই দিনে পালিত হয়। এই দিন হাজীসাহেবগণ নিম্নোক্ত আমলগুলো পালন করেন:

  • আকাবা জমরাতে কংকর নিক্ষেপ করেন।
  • কোরবানী করেন।
  • মাথা মুণ্ডন করেন কিংবা চুল ছোট করেন।
  • তাওয়াফ করেন।
  • সায়ী করেন।
  • এটি সর্বস্তরের মুসলমানদের ঈদের দিন।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “আরাফার দিন, কোরবানীর দিন ও তাশরিকের দিনগুলো আমরা মুসলমানদের জন্য ঈদের দিন। এ দিনগুলো পানাহারের দিন।”[সুনানে তিরমিযি (৭৭৩), আলবানী ‘সহিহুত তিরমিযি’ গ্রন্থে হাদিসটিকে সহিহ আখ্যায়িত করেছেন]

আল্লাহই ভাল জানেন।

 

তারা মীনার বাহিরে রাত্রি যাপন করেছে; তারা জানত না যে মীনা তাদের নিকটে

 

 

আলহামদুলিল্লাহ।

 

এক:

তাশরিকের তিনরাত্রি মীনাতে যাপন করা হজ্জের ওয়াজিব আমল। যে ব্যক্তি কোন ওজর ছাড়া মীনাতে রাত্রিযাপন পরিত্যাগ করবে জমহুর আলেমের মতে, তার উপর দম (পশু যবাই) আবশ্যক হবে।

আল-মাওসুআ আল-ফিকহিয়্যা (১৭/৫৮) গ্রন্থে এসেছে,

তাশরিকের রাতগুলো মীনাতে যাপন করা জমহুর আলেমের মতে ওয়াজিব। যে ব্যক্তি কোন ওজর ছাড়া এ আমল ত্যাগ করবে তাকে দম দিতে হবে।

 

দুই:

যে ব্যক্তি মীনাতে রাত্রিযাপন করতে সক্ষম কিন্তু মীনার সীমানা না জানার কারণে মীনাতে রাত্রি যাপন করতে পারেনি এটি ওজর হিসেবে ধর্তব্য হবে না। কারণ সে ব্যক্তির উপর হচ্ছে- মীনা সম্পর্কে লোকদের জিজ্ঞেস করা; যাতে মীনাতে রাত্রিযাপন করতে পারে।

শাইখ বিন বায (রহঃ) বলেন:

যে ব্যক্তি মীনার সীমানা না জানার কারণে সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও মীনাতে রাত্রিযাপন করতে পারেনি তার উপর দম ওয়াজিব হবে। কারণ সে ব্যক্তি কোন শরয়ি ওজর ছাড়া একটি ওয়াজিব আমল ছেড়ে দিয়েছে। তার উপর ওয়াজিব ছিল মানুষকে জিজ্ঞেস করা যাতে করে এ ওয়াজিব আমলটি পালন করতে পারে।[শাইখ বিন বাযের ফতোয়াসমগ্র (১৬/১৪৯) থেকে সমাপ্ত]

এর আলোকে বলা যায় যে, যদি মীনাতে রাত্রিযাপন করার জন্য আপনাদের জায়গা থাকে তাহলে এ ওয়াজিব আমল পরিত্যাগ করতে আপনার কোন ওজর নেই। এ আমলটি ত্যাগ করার কারণে আপনাদের উপর সদকা করা ওয়াজিব হবে; দম (পশু জবাই) নয়। কারণ দম ওয়াজিব হয় সবকটি রাত যাপন পরিহার করার কারণে।

নববী (রহঃ) বলেন:

যদি তাশরিকের তিন রাত যাপন করা পরিত্যাগ করে তাহলে তার উপর দম ওয়াজিব হবে; এটাই মাযহাবের অভিমত…। আর যদি দুই রাত্রি যাপন পরিত্যাগ করে তাহলে বিশুদ্ধ মতানুযায়ী দুই মুদ্দ (দুই মুদ্দ খাদ্য সদকা করা) ওয়াজিব হবে।[আল-মাজমু (৮/২২৫) থেকে সমাপ্ত]

শাইখ উছাইমীন (রহঃ) বলেন:

গ্রন্থকারের কথা “অথবা যদি সেথায় রাত্রিযাপন না করে” এর থেকে জানা গেল যে, যদি একরাত যাপন করা পরিত্যাগ করে তাহলে দম ওয়াজিব হবে না। এটাই ঠিক। বরং তার উপর অপরিহার্য হবে- এক রাত যাপন না করলে একজন মিসকীনকে খাদ্য খাওয়ানো; দুই রাত যাপন না করলে দুইজন মিসকীনকে খাদ্য খাওয়ানো। আর তিন রাত যাপন না করলে তার উপর দম ওয়াজিব হবে।[আল-শারহুল মুমতি (৭/৩৫৮) থেকে সমাপ্ত]

মোদ্দাকথা, সে রাতে মীনাতে রাত যাপন ত্যাগ করার কারণে আপনাদের উপর একজন মিসকীন খাওয়ানো ওয়াজিব হবে।

 

 

من حج فلم يرفث… হাদিসটির অর্থ কী?

 

 

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী: 
من حج فلم يرفث ولم يفسق رجع من ذنوبه كيوم ولدته أمه

 

আলহামদুলিল্লাহ।

হাদিসটি বুখারি (১৫২১) ও মুসলিম (১৩৫০) আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “যে ব্যক্তি হজ্জ আদায় করল; কিন্তু কোন যৌনাচার কিংবা পাপ করল না সে ঐ অবস্থায় ফিরে আসবে যে অবস্থায় তার মা তাকে প্রসব করেছে।”

তিরমিযির এক বর্ণনায় (৮১১) এসেছে-“তার পূর্বের সব গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে।”[আলবানি সহিহ তিরমিযি গ্রন্থে হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন]

এ হাদিসটি আল্লাহ তাআলার সে বাণীর মত-

( الْحَجُّ أَشْهُرٌ مَعْلُومَاتٌ فَمَنْ فَرَضَ فِيهِنَّ الْحَجَّ فَلا رَفَثَ وَلا فُسُوقَ وَلا جِدَالَ فِي الْحَجِّ )

“অর্থ- হজ্বের নির্দিষ্ট কয়েকটি মাস আছে। যে ব্যক্তি সেসব মাসে নিজের উপর হজ্ব অবধারিত করে নেয় সে হজ্বের সময় কোন যৌনাচার করবে না, কোন গুনাহ করবে না এবং ঝগড়া করবে না।”[সূরা বাকারা (২): ১৯৭]

الرفث বলা হয় অশ্লীল কথাকে। মতান্তরে, সহবাসকে।

ইবনে হাজার বলেন:

হাদিসে الرفثদ্বারা এর চেয়ে ব্যাপক অর্থ উদ্দেশ্য। কুরতুবীও এ মতের দিকে ধাবিত হয়েছেন। রোজা সংক্রান্ত হাদিস ( فَإِذَا كَانَ صَوْم أَحَدكُمْ فَلا يَرْفُث ) (অর্থ- তোমাদের কেউ যেদিন রোজা রাখে সে যেন رفث না করে) এর বাণীতেও একই ব্যাপকতা উদ্দেশ্য। সমাপ্ত

অর্থাৎ হাদিসে رفث শব্দটি অশ্লীল কথা ও সহবাস উভয়টিকে শামিল করে।

হাদিসের বাণী: ولم يَفْسُقْ এর মানে হচ্ছে- কোন পাপকাজ কিংবা অবাধ্যতামূলক কাজ করেনি।

হাদিসের বাণী: كَيَوْمِوَلَدَتْهُأُمّه (অর্থ-ঐ দিনের ন্যায় ফিরে এল যে দিন তার মা তাকে প্রসব করেছে) অর্থাৎ- নিষ্পাপভাবে।

হাদিসের আপাত অর্থ হচ্ছে- এতে সগিরা-কবিরা উভয় প্রকার গুনাহ মাফ হবে- এটি ইবনে হাজার বলেছেন।

কুরতুবী, কাযী ইয়ায প্রমুখ এ অভিমত ব্যক্ত করেছেন। তিরমিযি বলেন: মাফ পাওয়ার বিষয়টি সেসব গুনাহর সাথে খাস যেগুলো আল্লাহর অধিকারের সাথে সম্পৃক্ত; বান্দার অধিকারের সাথে নয়। মুনাওয়ি ‘ফায়যুল কাদির’ গ্রন্থে একই কথা বলেছেন।

শাইখ উছাইমীন (রহঃ) বলেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী:

من حج فلم يرفث ولم يفسق رجع من ذنوبه كيوم ولدته أمه

(অর্থ- যে ব্যক্তি হজ্জ আদায় করল, কিন্তু কোন যৌনাচার কিংবা পাপ করল না সে যেন ঐ দিনের ন্যায় ফিরে এল যে দিন তার মা তাকে প্রসব করেছে) অর্থাৎ কোন মানুষ যদি হজ্জ আদায় করে এবং আল্লাহ যা কিছু হারাম করেছেন সেসব থেকে বিরত থাকে ; সেসব হারাম বিষয়ের মধ্যে রয়েছে- رفث তথা নারী গমন, فسوق তথা আল্লাহর আনুগত্যের লঙ্ঘন। আল্লাহর আনুগত্যের লঙ্ঘন না করতে হলে আল্লাহ যা কিছু ফরজ করেছেন সেগুলো বর্জন করবে না এবং আল্লাহ যা কিছু হারাম করেছেন সেগুলোতে লিপ্ত হবে না। এর ব্যতিক্রম কিছু করলে তো সে فسوقতথা পাপ করল। অতএব, কোন ব্যক্তি যদি হজ্জ আদায় করে এবং فسوق ও رفث না করে তাহলে সে গুনাহ থেকে পুতপবিত্র হয়ে বের হবে যেভাবে মানুষ তার মাতৃগর্ভ থেকে নিষ্পাপভাবে বের হয়। অনুরূপভাবে এ ব্যক্তি যিনি এ শর্ত পূর্ণ করে হজ্জ আদায় করেছেন তিনিও গুনাহ থেকে পুতপবিত্র হয়ে বের হবেন।[শাইখ উছাইমীনের ফতোয়াসমগ্র (২১/২০)]

তিনি আরও (২১/৪০) বলেন: হাদিসটির বাহ্যিক অর্থ হচ্ছে- হজ্জের মাধ্যমে কবিরা গুনাহও মাফ হবে। সুতরাং কোন দলিল ছাড়া আমরা এ বাহ্যিক অর্থকে এড়িয়ে যেতে পারি না। কোন কোন আলেম বলেন: পাঁচ ওয়াক্ত নামায যখন কবিরা গুনাহ মোছন করে না; অথচ নামায হজ্জের চেয়ে মহান ইবাদত ও আল্লাহর নিকটে প্রিয়; সুতরাং হজ্জ কবিরা গুনাহ মোছন না করাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমরা বলব: হাদিসের বাহ্যিক অর্থ এটাই। আল্লাহর বিধিবিধানের মধ্যে অনেক গূঢ়রহস্য রয়ে আছে এবং সওয়াবের ক্ষেত্রে কোন যুক্তি চলে না।[কিঞ্চিত পরিমার্জিত ও সমাপ্ত]

 

 

হজ্জের কার্যাবলী শেষ হওয়ার আগে বিদায়ী তাওয়াফ করা শুদ্ধ নয়

 

 

আলহামদুলিল্লাহ।

বিদায়ী তাওয়াফ হচ্ছে- হজ্জের শেষ কাজ। তাই হজ্জের অন্য কাজের আগে বিদায়ী তাওয়াফ করা জায়েয নেই। দলিল হচ্ছে- ইবনে আব্বাস (রাঃ) এর হাদিস “লোকদেরকে নির্দেশ দেয়া হত তাদের সর্বশেষ কাজ যেন হয় বায়তুল্লাহর সাথে”

আল্লাহই উত্তম তাওফিকদাতা; আমাদের নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি, তাঁর পরিবার-পরিজন ও সাহাবীবর্গের প্রতি আল্লাহর রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক।সমাপ্ত

ফতোয়া ও গবেষণা বিষয়ক স্থায়ী কমিটি

শাইখ আব্দুল আযিয বিন বায, শাইখ আব্দুর রাজ্জাক আফিফি, শাইখ আব্দুল্লাহ বিন গাদইয়ান, শাইখ আব্দুল্লাহ বিন কুউদ।

 

 

আরাফার ময়দানে অবস্থান করার জন্য পবিত্রতা শর্ত নয়

 

 

আলহামদুলিল্লাহ।

এক:

জমহুর আলেমের মতে, পবিত্রতা ছাড়া তাওয়াফ শুদ্ধ হবে না। 34695 নং প্রশ্নোত্তরে এ মাসয়ালায় আলেমগণের ইখতিলাফ আলোচনা করা হয়েছে। অতএব, তাওয়াফে যাওয়ার সময় যার ওজু ভেঙ্গে গেছে তিনি ওজু করে নিবেন; এরপর তাওয়াফ শুরু করবেন। এটি উত্তম এবং সাবধানতা রক্ষামূলক রায়।

 

দুই:

উকুফে আরাফা বা আরাফার ময়দানে অবস্থানের জন্য পবিত্রতা শর্ত নয়। অতএব, হাজীসাহেব ওজু ছাড়া আরাফার ময়দানে অবস্থান করতে পারেন। শুধু নামাযের জন্য ছাড়া ওজু করা তার উপর অপরিহার্য নয়। আলেমগণ এ ব্যাপারে একমত যে, ঋতুবতী নারী ও গোসল ফরজ হয়েছে এমন ব্যক্তির আরাফায় অবস্থান করাও শুদ্ধ।

ইমাম নববী ‘আল-মাজমু’ কিতাবে (৮/১৪০) বলেন: ইবনুল মুনযির বলেন: “আলেমগণ এ ব্যাপারে ইজমা করেছেন যে, অপবিত্র অবস্থা নিয়ে নারী বা পুরুষের আরাফায় অবস্থান শুদ্ধ হবে। যেমন- জুনুব (যার উপর গোসল ফরজ হয়েছে) ও হায়েযগ্রস্ত নারী। সমাপ্ত

তবে আরাফায় অবস্থানকারীর জন্য ছোট অপবিত্রতা ও বড় অপবিত্রতা থেকে মুক্ত থাকা মুস্তাহাব। কারণ আরাফায় অবস্থানকারী আল্লাহর যিকির (স্মরণ) করবে। আল্লাহর যিকিরকালে ওজু থাকা মুস্তাহাব।

দেখুন: কাশশাফুল কিনা (২/৪৯৪)

আল্লাহই ভাল জানেন।

 

 

অন্যের খরচে হজ্জ আদায় করা

 

 

আলহামদুলিল্লাহ।

অন্যের খরচে কারো হজ্জ আদায় করতে কোন অসুবিধা নেই। সেই অন্য ব্যক্তি তার ছেলে হোক, ভাই হোক অথবা বন্ধু হোক…। এটি হজ্জের শুদ্ধতার উপর কোন প্রভাব ফেলবে না। হজ্জ শুদ্ধ হওয়ার জন্য এমন কোন শর্ত নেই যে, ব্যক্তি তার নিজের অর্থ থেকেই খরচ করতে হবে।

স্থায়ী কমিটিকে এমন এক নারী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছে যাকে আমন্ত্রণকারী তার হজ্জের যাবতীয় খরচ বহন করেছে।

তাঁরা উত্তরে বলেন:

তিনি যে নিজের অর্থ খরচ করে হজ্জ করেননি কিংবা নিজে সামান্য কিছু খরচ করেছেন আর অন্য ব্যক্তি বেশিরভাগ খরচ করেছে; এতে ফরজ আদায়ের উপর কোন প্রভাব পড়বে না। অতএব, হজ্জের শর্ত, রুকন ও ওয়াজিবগুলো যদি যথাযথভাবে আদায় হয়ে থাকে তাহলে তার উপর থেকে হজ্জের ফরজিয়ত (ফরজ দায়িত্ব) আদায় হয়ে গেছে; যদিও অন্য কেউ তার হজ্জের খরচ বহন করে থাকুক না কেন। সমাপ্ত [স্থায়ী কমিটির ফতোয়াসমগ্র (১১/৩৪)]

স্থায়ী কমিটিকে (১১/৩৬) রাষ্ট্রীয় খরচে হজ্জ আদায় করার হুকুম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে উত্তরে তাঁরা বলেন: এটি জায়েয। এ সংক্রান্ত দলিলগুলোর সাধারণত্বের ভিত্তিতে তাদের হজ্জ সহিহ হবে। সমাপ্ত

স্থায়ী কমিটির ফতোয়াসমগ্রে (১১/৩৭) এটাও আছে যে,

যদি কোন সন্তান তার পিতার অর্থে ফরজ হজ্জ আদায় করে তাহলে তার হজ্জ সহিহ।সমাপ্ত

যে ব্যক্তি কোন প্রতিযোগিতাতে জিতে পুরস্কার হিসেবে হজ্জ আদায় করেছেন তার সম্পর্কে স্থায়ী কমিটি (১১/৪০) আর বলেন যে, এটি তার ফরজ হজ্জ হিসেবে ধর্তব্য হবে এবং সে দায় মুক্ত হবে।

 

 

কিভাবে আপনার হজ্জটি মকবুল হজ্জ হবে?

 

 

আলহামদুলিল্লাহ।

হজ্জটি হজ্জে মকবুল হওয়ার জন্য একজন হাজীসাহেবের যে বিষয়গুলো জানা থাকা প্রয়োজন:

-হজ্জের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টির নিয়ত করা। এটাকে বলে- ইখলাস। এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর দেখানো পদ্ধতি অনুযায়ী হজ্জ আদায় করা। এটাকে বলা হয়- মুতাবাআ (অনুসরণ)। যে কোন নেক কাজ এ দুটি র্শত পূর্ণ করা ছাড়া কবুল হয় না: ইখলাস ও মুতাবাআ (রাসূলের অনুসরণ)। দলিল হচ্ছে- আল্লাহর বাণী: “তাদের প্রতি তো এ নির্দেশ-ই ছিল যে, তারা শিরকমুক্ত ইখলাসভিত্তিক আল্লাহর ইবাদত করবে, নামায কায়েম করবে এবং যাকাত দেবে। এটাই বক্রতামুক্ত ধর্ম।[সূরা আল-বাইয়্যেনা, আয়াত: ৫] এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী: “সকল আমল নিয়্যত অনুযায়ী হয়ে থাকে। এবং প্রত্যেক ব্যক্তি যা নিয়ত করেন তিনি সেটাই পাবেন” এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বাণী: “যে ব্যক্তি এমন কোন আমল করবে যার অনুমোদন আমাদের শরিয়তে নেই সেটা প্রত্যাখ্যাত।” সুতরাং একজন হাজী সাহেব যে যে ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি জোর দিবেন সেটা হচ্ছে- ইখলাস ও মুতাবাআ। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিদায়ী হজ্জকালে বলতেন: “তোমরা আমার নিকট থেকে তোমাদের হজ্জ করার পদ্ধতি জেনে নাও।”

-হজ্জ আদায় করতে হবে হালাল সম্পদ দিয়ে। কারণ হারাম সম্পদ দিয়ে হজ্জ আদায় করাও হারাম; নাজায়েয। বরং কোন কোন আলেম বলেছেন: এমন হজ্জ শুদ্ধ হবে না। কেউ কেউ বলেন: যদি তুমি এমন সম্পদ দিয়ে হজ্জ কর যে সম্পদের উৎস হারাম তাহলে তুমি যেন হজ্জ করলে না; তোমার বাহনটা হজ্জ করল। অর্থাৎ উট হজ্জ করল।

-আল্লাহর নিষেধকৃত বিষয়গুলো থেকে বিরত থাকা। দলিল হচ্ছে-আল্লাহর বাণী: “অর্থ- হজ্বেরনির্দিষ্টকয়েকটিমাসআছে।যেব্যক্তিসেসবমাসেনিজেরউপরহজ্বঅবধারিতকরেনেয়সেহজ্বেরসময়কোনযৌনাচারকরবেনা, কোনগুনাহকরবেনাএবংঝগড়াকরবেনা।[সূরাবাকারা;২: ১৯৭] অতএব, হাজীসাহেব যা কিছু হজ্জ সংক্রান্ত নিষিদ্ধ কিংবা সাধারণ নিষিদ্ধ যেমন- পাপাচার, অবাধ্যতা, হারাম কথা, হারাম কাজ, বাদ্য শুনা ইত্যাদি সবকিছু থেকে বিরত থাকবেন। অনুরূপভাবে যা কিছু হজ্জ সংক্রান্ত খাস নিষিদ্ধগুলো থেকেও বিরত থাকবেন। যেমন- যৌনাচার, মাথা মুণ্ডন করা, ইহরাম অবস্থায় যা কিছু পরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিষিদ্ধ করেছেন সেসব থেকে বেঁচে থাকা। অন্য ভাষায়: ইহরাম অবস্থায় যা কিছু নিষিদ্ধ সেসব থেকে বেঁচে থাকা।

-অনুরূপভাবে হাজী সাহেবের উচিত কোমল, সহজপ্রাণ এবং লেনদেনও কাজকর্মে উদার হওয়া। যতটুকু সম্ভব সহযাত্রীদের সাথে ভাল ব্যবহার করা। কোন মুসলমানকে কষ্ট দেয়া থেকে বিরত থাকা তার উপর ফরজ। সেটা হজ্জের পবিত্র স্থানগুলোতে হোক কিংবা বাজারে হোক। হাজীসাহেব তাওয়াফকালে ভীড় করে কাউকে কষ্ট দিবেন না। সায়ীকালে কাউকে কষ্ট দিবেন না। জমরাতে কাউকে কষ্ট দিবেন না। অন্য কোন স্থানেও কষ্ট দিবেন না। হাজীসাহেবের এ বিষয়গুলো পালন করা বাঞ্ছনীয় কিংবা আবশ্যকীয়। এভাবে হজ্জ আদায় করার জন্য হাজীসাহেব কোন আলেমের সাহচর্যে থেকে হজ্জ আদায় করতে পারেন; যাতে করে সে আলেম তাকে দ্বীনি বিষয়গুলো স্মরণ করিয়ে দিতে পারেন। আর যদি সেটা সম্ভব না হয় তাহলে হজ্জে যাওয়ার আগে নির্ভরযোগ্য আলেমদের গ্রন্থ অধ্যয়ন করা উচিত; যাতে সুস্পষ্ট জ্ঞানের ভিত্তিতে ব্যক্তি আল্লাহর ইবাদত করতে পারে। সমাপ্ত

 

 

শুক্রবারে আরাফার দিন হওয়ার কোন বিশেষত্ব বা ফজিলত আছে কি?

 

 

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য। শুক্রবারে আরাফা হলে সে বছরের হজ্জ সাত হজ্জের সমতুল্য এই মর্মে আমরা কোন হাদিস জানি না। তবে যেটা বর্ণিত আছে সেটা হচ্ছে- ৭০ হজ্জের সমতুল্য বা ৭২ হজ্জের সমতুল্য। কিন্তু কোন অবস্থাতে এ দুটি বর্ণনা সহিহ নয়। প্রথম উক্তিটি এক হাদিসের মতনে এসেছে তবে সে হাদিসটি বাতিল, সহিহ নয়। আর দ্বিতীয় উক্তিটির কোন সনদ বা মতন আমি পাইনি। এর কোন ভিত্তি নেই। উদ্ধৃত হাদিসের বক্তব্য হচ্ছে-

“সর্বোত্তম দিন হচ্ছে- যদি শুক্রবারে আরাফা হয়। সে হজ্জ শুক্রবারে হজ্জ নয় এমন ৭০ টি হজ্জের চেয়ে উত্তম।”

ইমামগণ এ হাদিসকে বাতিল ও গয়রে সহিহ আখ্যায়িত করেছেন:

১. ইবনুল কায়্যিম (রহঃ) বলেন:

পক্ষান্তরে মানুষের মুখে যা চালু আছে- এ হজ্জ ৭২টি হজ্জের সমান – এটি বাতিল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বা সাহাবায়ে কেরাম বা তাবেয়ীগণ হতে এর কোন ভিত্তি নেই। আল্লাহই ভাল জানেন।[যাদুল মাআদ (১/৬৫)]

২. শাইখ আলবানী (রহঃ) ‘সিলসিলা যায়িফা’ গ্রন্থে হাদিসটিকে বাতিল ও গয়রে সহিহ আখ্যায়িত করার পর বলেন: কিন্তু “হাদিসটি রাযিন ইবনে মুয়াবিয়া ‘তাজরিদুস সিহাহ’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন”‘হাসিয়াতু ইবনে আবেদীন’ গ্রন্থে (২/৩৪৮) যাইলায়ীর এমন বক্তব্যের ব্যাপারেজেনে রাখুন রাযিনের এ গ্রন্থে সিহাহ সিত্তা (বুখারি, মুসলিম, মুয়াত্তা মালেক, সুনানে আবু দাউদ, সুনানে নাসাঈ, সুনানে তিরমিজি) এর হাদিসগুলো সংকলন করা হয়েছে যে পদ্ধতিতে ইবনুল আছির তাঁর ‘জামেউল উসুল মিন আহাদিছির রাসূল’ গ্রন্থে সংকলন করেছেন। তবে ‘তাজরিদুস সিহাহ’ গ্রন্থে এমন অনেক হাদিস আছে মূল গ্রন্থগুলোতে যে হাদিসের অস্তিত্ব নেই। এবং অন্য আলেমগণ তাঁদের গ্রন্থে তাঁর থেকে যে বর্ণনাগুলো সংকলন করেন সেগুলোর ব্যাপারেও একই কথা যেমন- মুনযিরি তাঁর ‘আত-তারগীব ওয়াত তারহীব’ গ্রন্থে। উল্লেখিত হাদিসটি এ ধরনের একটি হাদিস মূল গ্রন্থগুলোতে যে হাদিসটির অস্তিত্ব নেই। এমনকি হাদিসের সুপরিচিত অন্য কোন গ্রন্থেও এ হাদিসেরঅস্তিত্ব নেই। বরঞ্চ আল্লামা ইবনুল কাইয়্যেম তাঁর ‘যাদ’ (১/১৭) নামক গ্রন্থে এটি বাতিল বলে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। তিনি জুমার দিনে আরাফার দিন হওয়ার ১০টি মর্যাদা উল্লেখ করার পর বলেন: পক্ষান্তরে সাধারণ মানুষের মুখে প্রচলিত আছে যে, এটি ৭২টি হজ্জের সমান- এ কথা বাতিল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বা সাহাবায়ে কেরাম বা তাবেয়ীগণ হতে এর কোন ভিত্তি নেই।

মুনাবি ‘ফাতহুল কাদির’ (২/২৮) গ্রন্থে অতঃপর ইবনে আবেদনী ‘হাসিয়া’ নামক গ্রন্থে ইবনুল কাইয়্যেম এর মতকে সমর্থন করেছেন।[সমাপ্ত]

‘সিলসিলা যায়িফা’ (১১৯৩) গ্রন্থে বলেন: সাখাবি ‘আল-ফাতাওয়া আল-হাদিসিয়া’ (২/১০৫) গ্রন্থে বলেন: “রাযিন তার সংকলিত গ্রন্থে হাদিসটিকে মারফু হাদিস হিসেবে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু বর্ণনাকারী সাহাবী কে? অথবা হাদিসটি কে বর্ণনা করেছেন তা উল্লেখ করেননি। আল্লাহই ভাল জানেন।” সমাপ্ত

তিনি সিলসিলা যায়িফা (৩১৪৪) গ্রন্থে আরও বলেন:

হাফেয ইবনে হাজার ‘ফাতহুল বারী’ (৮/২০৪) গ্রন্থে রাযিনের সংকলনের উদ্ধৃতি দিয়ে হাদিসটি উল্লেখ করার পর বলেন: আমি এ হাদিসের অবস্থা জানি না। কারণ তিনি সাহাবীর নাম উল্লেখ করেননি এবং হাদিসটি কে তাখরিজ (সংকলন) করেছেন সেটাও উল্লেখ করেননি।

হাফেয নাসের উদ্দিন আল-দিমাশকি তার ‘ফাদলু ইয়াওমু আরাফা’ নামক পুস্তিকাতে বলেন: “জুমার দিনে আরাফায় অবস্থান ৭২ টি হজ্জের সমতুল্য” হাদিসটি বাতিল; সহিহ নয়। অনুরূপভাবে যির ইবনে হুবাইশ থেকে বর্ণিত যে, “এই হজ্জ জুমার দিনে হজ্জ নয় এমন ৭০টি হজ্জের চেয়ে উত্তম।” হাদিসটিও সাব্যস্ত নয়। সমাপ্ত

৩. শাইখ উছাইমীন (রহঃ) কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল:

জুমরা দিন হজ্জ হওয়ার ফজিলতের ব্যাপারে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে কিছু বর্ণিত আছে কিনা?

উত্তরে তিনি বলেন: জুমার দিন হজ্জ হওয়ার ফজিলত সম্পর্কে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হতে কিছু বর্ণিত নেই। তবে আলেমগণ বলেন: জুমার দিনে হজ্জ হওয়াটা উত্তম।

এক: এই হজ্জ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হজ্জের সাথে মিলে যায়। কারণ নবী সাল্লাল্লামের আরাফায় অবস্থান জুমার দিনে ছিল।

দুই: জুমার দিনে এমন একটি সময় থাকে যে সময়ে কোন মুসলিম বান্দা যদি দাঁড়িয়ে নামাযরত অবস্থায় আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে তবে সেটা কবুল হওয়ার অধিক উপযুক্ত।

তিন: আরাফার দিন ঈদ ও জুমার দিনও ঈদ। সুতরাং দুই ঈদের একত্রিত হওয়াটা কল্যাণকর।

পক্ষান্তরে যা মশহুর হয়ে গেছে যে, জুমার দিনে হজ্জ সত্তরটি হজ্জের সমান-গয়রে সহিহ।[আললিকা আশশাহরি (৩৪/১৮)]

৪. স্থায়ী কমিটির আলেমগণকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল:

কিছু মানুষ বলে: জুমাবার যদি হজ্জ হয় যেমন এ বছর হচ্ছে সেটা ৭টি হজ্জ আদায় করার সমান- এর পক্ষে কি সুন্নাহর কোন দলিল আছে?

তাঁর উত্তরে বলেন: এ বিষয়ে কোন সহিহ দলিল নেই। বরং কিছু মানুষ দাবী করছে, এটি ৭০টি হজ্জের সমান বা ৭২টি হজ্জের সমান- এটাও সহিহ নয়।[স্থায়ী কমিটির ফতোয়াসমগ্র (১১/২১০ ও ২১১)]

আরও দেখুন: ফাতহুল বারী (৮/২৭১) ও তুহফাতুল আহওয়াজি (৪/২৭)।

দুই: এ কথাটি বিস্তার লাভ করার কারণ বোধহয় এই যে, এটি হানাফি মাযহাব ও শাফেয়ি মাযহাবের কিতাবগুলোতে উল্লেখ করা হয়েছে।

হানাফিরা বলেন: জুমার দিনে হজ্জ হওয়া ৭০টি হজ্জের সমতুল্য। এমন জুমার দিনে প্রত্যেক ব্যক্তিকে কোন মাধ্যম ছাড়া ক্ষমা করে দেয়া হয়।

তাঁরা আরও বলেন: জুমার দিনে হজ্জ হলে সেটি সবচেয়ে উত্তম দিন। এটি সাধারণ ৭০ টি হজ্জের চেয়ে মর্যাদাপূর্ণ।[রাদ্দুল মুহতার আলাদ দুররিল মুখতার (২/৬২১)]

শাফেয়িরা বলেন:

বর্ণিত আছে- জুমার দিন আরাফা হলে আল্লাহ তাআলা সকল আরাফাবাসীকে মাফ করে দেন। অর্থাৎ মাধ্যম ছাড়া মাফ করে দেন। আর জুমা ছাড়া অন্যদিন হজ্জ হলে মাধ্যমে মাফ করেন। অর্থাৎ নেককারদের উসিলায় বদকারদের মাফ করে দেন।[মুগনিল মুহতাজ (১/৪৯৭)]

তিন: হাদিসটি বাতিল হওয়ায় জুমার দিনে আরাফা হওয়ার যে, মর্যাদা নেই এমনটি নয়। বরং ইবনুল কাইয়্যেম ১০টি মর্যাদা উল্লেখ করেছেন। আমরা এখানে সেগুলো উল্লেখ করব:

তিনি বলেন:

সঠিক মতানুযায়ী জুমার দিন সপ্তাহের সবচেয়ে উত্তম দিন। আরাফার দিন ও কুরবানীর দিন বছরের সবচেয়ে উত্তম দিন। অনুরূপভাবে লাইলাতুল কদর ও জুমার রাত বছরের সবচেয়ে উত্তম রাত।এ কারণে জুমার দিন আরাফায় অবস্থানের অনেক মর্যাদা রয়েছে যেমন:

এক. উত্তম দুটি দিন একত্রিত হওয়া

দুই. এটি এমন দিন যে দিনে এমন একটি সময় আছে যে সময়ে দুআ কবুল হওয়া সুনিশ্চিত। অধিকাংশ আলেমের মতে সে সময় আসরের পর। আর এ সময়ে আরাফাবাসী দুআতে ও রোনাজারিতে মশগুল থাকেন।

তিন. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আরাফায় অবস্থানের সাথে হুবহু মিলে যাওয়া।

চার. পৃথিবীর সর্ব প্রান্তের মুসলমান খোতবা শুনার জন্য ও জুমার নামায আদায় করার জন্য মসজিদে একত্রিত হওয়া। একই সময়ে আরাফাবাসী আরাফাতে একত্রিত হওয়া। এভাবে সমস্ত মুসলমান নিজ নিজ মসজিদে একত্রিত হওয়া ও আরাফাবাসীর দুআর ও রোনাজারির জন্য একত্রিত হওয়ার মাধ্যমে এমন কিছু অর্জিত হয় যা অন্য মাধ্যমে অর্জিত হয় না।

পাঁচ. জুমার দিন ঈদের দিন। আর আরাফার দিন আরাফাবাসীর জন্য ঈদতুল্য। এজন্য আরাফাবাসীর জন্য সেদিন রোজা রাখা মাকরুহ।…

আমাদের শাইখ (অর্থাৎ ইবনে তাইমিয়া) বলেন: আরাফার দিন আরাফাবাসীর জন্য ঈদ। যেহেতু তারা এ দিনে সবাই একত্রিত হন। পক্ষান্তরে অন্য মুসলমানেরা কুরবানীর দিন মিলিত হন। এ কারণে আরাফার দিন তাদের জন্য ঈদ। মূল কথা হচ্ছে- যদি আরাফার দিন ও জুমার দিনে পড়ে তাহলে দুই ঈদ একত্রিত হয়।

ছয়. এ দিনে মুমিন বান্দাদের জন্য আল্লাহর দেয়া শরিয়ত পরিপূর্ণ করা ও নেয়ামত পূর্ণ করার দিন। সহিহ বুখারিতে তারেক বিন শিহাব হতে বর্ণিত তিনি বলেন: এক ইহুদি উমর ইবনে খাত্তাব (রাঃ) এর নিকট এসে বলল: হে আমীরুল মুমেনীন, আপনারা আপনাদের ধর্মগ্রন্থে এমন একটি আয়াত পড়েন যদি সে আয়াতটি আমাদের ইহুদিদের উপর নাযিল হত আর আমরা জানতাম কোনদিন এ আয়াতটি নাযিল হয়েছে তাহলে আমরা সেদিনকে ঈদ হিসেবে গ্রহণ করতাম। তিনি বললেন: কোন আয়াতটি? ইহুদি বলল:

الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا

(অর্থ- আজ আমি তোমাদের জন্যে তোমাদের দ্বীনকে পূর্নাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদেরপ্রতি আমার নেয়ামত সম্পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্যে দ্বীনহিসেবে পছন্দ করলাম।)[সূরা মায়েদা, আয়াত:০৩] তখন উমর (রাঃ) বলেন: নিশ্চয় আমি জানি যেদিন ও যে স্থানে এ আয়াতটি নাযিল হয়েছে। এটি আরাফার ময়দানে শুক্রবারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর নাযিল হয়েছে। তখন আমরা তাঁর সাথে আরাফার ময়দানে অবস্থান করছিলাম।

সাত. এটি কেয়ামতের দিনের মহা সম্মেলনের সাথে মিলযুক্ত। কারণ কেয়ামত শুক্রবারে সংঘটিত হবে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “সর্বোত্তম দিন হচ্ছে জুমার দিন। এদিনে আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছে। এ দিনে তাঁকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়েছে, এ দিনে তাঁকে জান্নাত থেকে বের করে দেয়া হয়েছে এবং এ দিনে কেয়ামত সংঘটিত হবে। এ দিনে এমন একটি সময় রয়েছে যদি কোন মুসলিম বান্দা সে সময়ে আল্লাহর কাছে ভাল কিছু চাইতে পারে আল্লাহ তাকে তা দান করেন।”

আট. জুমার দিনে ও রাতে মুসলমানদের আমল অন্য দিনের তুলনায় বেশি হয়ে থাকে। এমনকি পাপীরাও জুমার দিন ও রাতকে সম্মান করে থাকে এবং মনে করে থাকে এ দিনে যে ব্যক্তি গুনাহ করার স্পর্ধা দেখায় আল্লাহ তাকে অবিলম্বে শাস্তি দেন; দেরি করেন না। এটি তাদের নিকট স্বতঃসিদ্ধ। অভিজ্ঞতার মাধ্যমে তারা তা জেনেছে। তা এ দিনের মহান মর্যাদা, সম্মান ও আল্লাহর নিকট মনোনীত দিন হওয়ার কারণে। কোন সন্দেহ নেই এ দিনে আরাফায় অবস্থান নিতে পারার মর্যাদা অনেক বেশি।

নয়. জুমার দিন জান্নাতে কিছু বাড়তি পাওয়ার দিন…। এ দিন ও আরাফার দিন যদি মিলিত হয় তাহলে এর বাড়তি মর্যাদা থাকাটাই স্বাভাবিবক।

দশ. আরাফার দিন বিকেল বেলা আল্লাহ তাআলা আরাফাবাসীর নিকটবর্তী হন এবং ফেরেশতাদের কাছে তাদেরকে নিয়ে গর্ব করেন…

এ কারণগুলো এবং এগুলো ছাড়াও আর কারণ আছে যা জুমার দিনে আরাফায় অবস্থানকে বিশেষত্ব দিচ্ছে।

কিন্তু মানুষের মুখে মুখে যা চালু আছে যে, জুমার দিনের হজ্জ ৭২টি হজ্জের সমান এটি বাতিল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে অথবা কোন সাহাবী কিংবা কোন তাবেয়ী থেকে এ ধরনের কোন বর্ণনার ভিত্তি নেই।

যাদুল মাআদ (১/৬০-৬৫) থেকে সংক্ষেপিত। আল্লাহই ভাল জানেন।

 

 

যিনি হজ্ব করতে চাচ্ছেন কিন্তু হজ্বের কার্যাবলী জানেন না?

 

 

আলহামদুলিল্লাহ।

যিনি হজ্ব করার ইচ্ছা করেন হজ্ব করার পদ্ধতি শিখে নেয়াতাঁর উপর ফরজ। অন্ততঃপক্ষে সুন্নাহর অনুসারী নির্ভরযোগ্য কোন একজন আলেমের সহজ সরল ছোট্ট একটি কিতাব সাথে রাখা এবং সে কিতাব অনুযায়ী আমলগুলো সম্পন্ন করা। এ ধরনের কিতাবগুলোর মধ্যে রয়েছে-

১. শাইখ বিন বাযের “আত তাহকীক ওয়াল ঈযাহ লি কাছিরিন মিন মাসায়িলিল হাজ্ব ওয়াল উমরা”।

২. শাইখ উছাইমীনের “মানাসিকুল হাজ্ব ওয়াল উমরা”।

কোন বিষয় বুঝতে অসুবিধা হলে আলেমদেরকে জিজ্ঞেস করা। কোন একজন আলেম বা তালিবে ইলমের সঙ্গে হজ্ব যাওয়া।যেন সে আলেম বা তালেবে ইলম আগে থেকেই তাঁকে বিধিবিধানগুলো শিখিয়ে দিতে পারেন। যে কাফেলাগুলোর সাথে কোন দায়ী বা তালিবে ইলম হজ্ব করে থাকেন সেগুলোর অনুসন্ধান করে সে রকম কোন কাফেলার সাথে হজ্বে যাওয়া। শাইখ উছাইমীনকে ধরনের একটি প্রশ্ন জিজ্ঞেস করা হলে জবাবে তিনি বলেন:

আল্লাহ তাআলা তাঁর কালামে পাকে এই প্রশ্নের যে জবাব দিয়েছেন এই প্রশ্নের ব্যাপারে আমারও সেই জবাব“তোমরা না জানলে আলেমগণকে জিজ্ঞেস কর।”[সূরা নাহল, আয়াত: ৪৩] যে ব্যক্তি কোন ইবাদতের বিধিবিধান জানেন না তার কর্তব্য হলো আলেমগণকে জিজ্ঞেস করা; যাতে করে তিনি সুস্পষ্ট জ্ঞানের ভিত্তিতে আল্লাহর ইবাদত করতে পারেন। কারণ ইবাদত কবুলের শর্ত হচ্ছে- আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠতাও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদর্শেরপূর্ণ অনুসরণ। রাসূলসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কিভাবে কোন বাচনিক ইবাদত বা কর্মকেন্দ্রিক ইবাদত পালন করতেন তা জানতে হবে। তা না জানলে তাঁকে অনুসরণ করা সম্ভব নয়। তাই আমি এ প্রশ্নকারীকে বলব: আপনি যখনহজ্ব করতে চান অথচ হজ্বের বিধিবিধান আপনার জানা নেইএমতাবস্থায় আপনার উপর ফরজ এ সম্পর্কে আলেমগণকে জিজ্ঞেস করা। আমি এ ব্যাপারেও তাগিদ দিচ্ছি যারা হজ্বে যেতে চান তারা যেন কোন আলেমের সঙ্গে বা তালিবে ইলমের সঙ্গে হজ্বে যান;যে আলেম বা তালিবে ইলম হজ্বের সাথে সংশ্লিষ্ট মাসয়ালাগুলো জানেন।যাতে করে তারা সে আলেমের নির্দেশনা মোতাবেক হজ্ব আদায় করতে পারেন।

শাইখ উছাইমীনের ফতোয়াসমগ্র (২২/৫০)

 

ইসলামে হজ্জের মর্যাদা ও হজ্জ ফরজ হওয়ার শর্তাবলী

 

 

মস্ত প্রশংসা আল্লাহ তাআলার জন্য।

বায়তুল্লাহ শরীফের হজ্জ আদায় করা ইসলামের অন্যতম একটি রুকন ও মূল ভিত্তি। দলীল হচ্ছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বাণী:

“ইসলাম পাঁচটি ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। এই সাক্ষ্য দেয়া যে, নেই কোন সত্য উপাস্য শুধু আল্লাহ ছাড়া এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল (বার্তাবাহক)। নামায কায়েম করা। যাকাত প্রদান করা। রমজান মাসে রোযা রাখা। বায়তুল্লাতে হজ্জ আদায় করা।”

আল্লাহর কিতাব, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাদিস ও উম্মতের ইজমা (ঐকমত্য) এর ভিত্তিতে হজ্জের ফরজিয়ত সাব্যস্ত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন: “এবং সামর্থ্যবান মানুষের উপর আল্লাহর জন্য বায়তুল্লাহর হজ্জ করা ফরয। আর যে ব্যক্তি কুফরী করে, তবে আল্লাহ তো নিশ্চয় সৃষ্টিকুল থেকে অমুখাপেক্ষী।”[সূরা আলে ইমরান, ৩:৯৭]

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “আল্লাহ তাআলা তোমাদের উপর হজ্জ ফরজ করেছেন। সুতরাং তোমরা হজ্জ আদায় করো।” হজ্জ ফরজ হওয়ার ব্যাপারে মুসলমানদের ইজমা (ঐক্যমত) সংঘটিত হয়েছে। হজ্জ ফরজ হওয়ার বিষয়টি অবলীলায় জানা যায়। অতএব, যে ব্যক্তি মুসলিম সমাজে বাস করার পরেও হজ্জের ফরজিয়তকে অস্বীকার করবে সে কাফের। আর যে ব্যক্তি অবহেলা করে হজ্জ আদায় করে না সে ব্যক্তি বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। কারণ একদল আলেমের মতে, সেও কাফের। এ অভিমতটি ইমাম আহমাদ থেকেও বর্ণিত আছে। কিন্তু অগ্রগণ্য মত হচ্ছে- নামায ছাড়া অন্য কোন আমল ত্যাগ করার কারণে কাউকে কাফের বলা যাবে না। বিশিষ্ট তাবেয়ী আব্দুল্লাহ ইবনে শাকিক (রহঃ) বলেন: “আল্লাহ রাসূলের সাহাবীগণ নামায ছাড়া অন্য কোন আমল পরিত্যাগ করাকে কুফর সাব্যস্ত করতেন না। সুতরাং যে ব্যক্তি অবহেলাবশতঃ হজ্জ আদায় না করে মারা গেছে তিনি কাফের নন; তবে মহা ঝুঁকির মধ্যে তিনি রয়েছেন।”

তাই প্রত্যেক মুসলিমের উচিত আল্লাহকে ভয় করা। নিজের ক্ষেত্রে হজ্জ ফরজ হওয়ার শর্তগুলো পূর্ণ হলে অনতিবিলম্বে হজ্জ আদায় করা। কেননা প্রত্যেকটি ফরজ আমল অনতিবিলম্বে আদায় করা বাধ্যতামূলক, যতক্ষণ না এর বিপরীত কোন দলীল পাওয়া যায়। অতএব, হজ্জ আদায় করার সামর্থ্য থাকার পর, যাতায়াতের পথ সুগম হওয়ার পর হজ্জ আদায় না করে একজন মুসলিমের আত্মা কিভাবে শান্তি পেতে পারে?! কিভাবে একজন মুসলিম হজ্জকে পরবর্তী বছরের জন্য পিছিয়ে দিতে পারে, অথচ তিনি জানেন না- পরবর্তী বছর তিনি হজ্জে যেতে পারবেন, নাকি পারবেন না। এমনও হতে পারে তিনি তাঁর সামর্থ্য হারিয়ে ফেলেছেন। হতে পারে তিনি ধনী থেকে গরীব হয়ে গেছেন। হতে পারে তিনি ফরজ হজ্জ অনাদায় রেখে মারা গেলেন এবং ওয়ারিশরা তাঁর পক্ষ থেকে হজ্জ আদায় করানোর ব্যাপারে অবহেলা করবে।

 

 

হজ্জ ফরজ হওয়ার শর্ত পাঁচটি:

এক: ইসলাম। ইসলামের বিপরীত হচ্ছে- কুফর। সুতরাং কাফেরের উপর হজ্জ ফরজ নয়। কাফের যদি হজ্জ আদায়ও করে তাহলে সে আমল কবুল হবে না।

দুই: সাবালগ হওয়া। সুতরাং যে সাবালগ হয়নি তার উপর হজ্জ ফরজ নয়। যদি নাবালগ কেউ হজ্জ আদায় করে তবে তা নফল হজ্জ হিসেবে আদায় হবে এবং সে এর সওয়াব পাবে। সে যখন সাবালগ হবে তখন ফরজ হজ্জ আদায় করতে হবে। কারণ সে সাবালগ হওয়ার আগে যে হজ্জ করেছে- এর দ্বারা ফরজ হজ্জ আদায় হবে না।

তিন: বিবেকবুদ্ধি। এর বিপরীত হচ্ছে- বিকারগ্রস্ততা। সুতরাং পাগলের উপর হজ্জ ফরজ নয় এবং পাগলকে হজ্জ আদায় করতে হবে না।

চার: স্বাধীন হওয়া। সুতরাং ক্রীতদাসের উপর হজ্জ ফরজ নয়। যদি সে হজ্জ আদায় করে তবে তার হজ্জ নফল হিসেবে আদায় হবে। যদি সে স্বাধীন হয়ে যায় তাহলে তাকে ফরজ হজ্জ আদায় করতে হবে। কারণ দাস থাকাকালীন সে যে হজ্জ আদায় করেছে সেটা দ্বারা ফরজ হজ্জ আদায় হবে না। তবে কিছু কিছু আলেম বলেছেন: যদি ক্রীতদাস তার মালিকের অনুমতি নিয়ে হজ্জ আদায় করে তাহলে সে হজ্জ দ্বারা তার ফরজ হজ্জ আদায় হয়ে যাবে। এটাই অগ্রগণ্য মত।

পাঁচ: শারীরিক ও আর্থিক সামর্থ্য থাকা। মহিলার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত একটি সামর্থ্য হলো- হজ্জের সঙ্গি হিসেবে কোন মোহরেম পাওয়া। যদি নারীর এমন কোন মোহরেম না থাকে তাহলে তার উপর হজ্জ ফরজ নয়।

 

 

সূত্র: ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাব