ইহরাম অবস্থায় নিষিদ্ধ কার্যাবলী

ইহরামকারী যদি ভুলবশতঃ কিংবা অজ্ঞতাবশতঃ কোন একটি নিষিদ্ধ কাজে লিপ্ত হয় যাতে লিপ্ত হওয়া হারাম; তখন এর হুকুম কি?

আলহামদুলিল্লাহ।

শাইখ উছাইমীন বলেন: যদি ভুলবশতঃ কিংবা অজ্ঞতাবশতঃ কোন একটি নিষিদ্ধ কাজে লিপ্ত হয় তাহলে তার উপর কোন কিছু বর্তাবে না। কিন্তু, তার ওজর দূর হওয়ার সাথে সাথে সে নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত হওয়া কর্তব্য। ওয়াজিব হচ্ছে- ভুলকারীকে মনে করিয়ে দেয়া ও অজ্ঞ লোককে জ্ঞানদান করা।

ঊদাহরণতঃ- কোন ইহরামকারী যদি ভুলবশতঃ জামা পরে ফেলে তাহলে তার উপর কোন কিছু বর্তাবে না। কিন্তু, স্মরণ হওয়ার সাথে সাথে জামাটি খুলে ফেলতে হবে। অনুরূপভাবে কেউ যদি ভুলবশতঃ পায়জামা পরে থাকে, নিয়ত বাঁধা ও তালবিয়া পড়ার পর স্মরণে আসে তাহলে সাথে সাথে পায়জামা খুলে ফেলতে হবে এবং তার উপর কোন কিছু বর্তাবে না। অনুরূপ বিধান অজ্ঞ ব্যক্তির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। অজ্ঞের উপরেও কোন কিছু বর্তাবে না। ঊদাহরণতঃ গেঞ্জিতে সেলাই না থাকায় কেউ যদি এই মনে করে গেঞ্জি পরে যে, নিষিদ্ধ হচ্ছে- সেলাইযুক্ত পোশাক পরা; তাহলে তার উপর কোন কিছু বর্তাবে না। কিন্তু, যখনই সে জানতে পারবে যে, গেঞ্জির মধ্যে সেলাই না থাকলেও ইহরাম অবস্থায় গেঞ্জি পরা নিষিদ্ধ পোশাকের অন্তর্ভুক্ত তাহলে সাথে সাথে গেঞ্জি খুলে ফেলা কর্তব্য।

এ ক্ষেত্রে সাধারণ নীতি হল: কোন মানুষ যদি ভুলবশতঃ কিংবা অজ্ঞতাবশতঃ কিংবা জবরদস্তির শিকার হয়ে ইহরাম অবস্থায় কোন নিষিদ্ধ কাজে লিপ্ত হয় তাহলে তার উপর কোন কিছু বর্তাবে না। দলিল হচ্ছে আল্লাহর বাণী: “হে আমাদের রব্ব! যদি আমরা বিস্মৃত হই অথবা ভুল করি তবে আপনি আমাদেরকে পাকড়াও করবেন না।”[সূরা বাকারা, আয়াত: ২৮৬] আল্লাহ তাআলা বলেন: আমি সেটাই করব। আরও দলিল হচ্ছে আল্লাহর বাণী: “আর এ ব্যাপারে তোমরা কোন অনিচ্ছাকৃত ভুল করলে তোমাদের কোন অপরাধ নেই; কিন্তু তোমাদের অন্তর যা স্বেচ্ছায় করেছে (তা অপরাধ), আর আল্লাহ্‌ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।”[সূরা আহযাব, আয়াত: ৫] ‘শিকার-করা’ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন; যা ইহরাম অবস্থায় নিষিদ্ধ: “তোমাদের মধ্যে কেউ ইচ্ছে করে সেটাকে হত্যা করলে…।”[সূরা মায়িদা, আয়াত: ৯৫] এ ক্ষেত্রে ইহরামের নিষিদ্ধ বিষয় পোশাক, সুগন্ধি ও এ জাতীয় অন্য কিছু হোক কিংবা শিকার করা, মাথার চুল মুণ্ডন করা ও এ জাতীয় অন্য কোন নিষিদ্ধ বিষয় হোক— হুকুমের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। যদিও কোন কোন আলেম এ দুটোর মধ্যে পার্থক্য করেছেন। তবে, বিশুদ্ধ মত হচ্ছে- পার্থক্য নেই। কারণ এটি এমন নিষিদ্ধ কর্ম; অজ্ঞতা, ভুল ও জবরদস্তির কারণে যে ক্ষেত্রে মানুষের ওজর গ্রহণযোগ্য।

 সুগন্ধিযুক্ত টিস্যু পেপার ব্যবহার করার বিধান কি?

 

আলহামদুলিল্লাহ।

যদি সুগন্ধিযুক্ত টিস্যু পেপার ভেজা হয় এবং ভেজা পারফিউম ইহরামকারীর হাতে লাগে তাহলে সেটা ব্যবহার করা জায়েয নয়। আর যদি শুকনো হয় এবং শুধু ঘ্রাণ বের হয় এমন হয়, যেমন পুদিনা পাতার ঘ্রাণ বা আপেলের ঘ্রাণ এতে কোন অসুবিধা নেই।

ইহরাম অবস্থায় মুহরিমকে কোন কোন বিষয় থেকে বিরত থাকতে হবে?

আলহামদুলিল্লাহ।

ইহরামের নিষিদ্ধ বিষয়াবলী: ইহরামের কারণে ব্যক্তিকে যে বিষয়গুলো থেকে বিরত থাকতে হয়। যেমন:

১. মাথার চুল মুণ্ডন করা। দলিল হচ্ছে আল্লাহ তাআলার বাণী: “আর তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত মাথা মুণ্ডন করবে না, যতক্ষণ না কোরবানীর পশু যথাস্থানে পৌঁছে যাবে।”[সূরা বাকারা, আয়াত: ১৯৬] আলেমগণ মাথার চুলের সাথে শরীরের সমস্ত পশমকে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। অনুরূপভাবে নখ কাটা ও ছোট করাকেও এর অন্তর্ভুক্ত করেছেন।

২. ইহরাম বাঁধার পর সুগন্ধি ব্যবহার করা; কাপড়ে হোক কিংবা শরীরেহোক; খাবারদাবারে হোক কিংবা গোসলের সামগ্রীতে হোক কিংবা অন্য যে কোন কিছুতে হোক। অর্থাৎ ইহরাম অবস্থায় সুগন্ধি ব্যবহার করা হারাম। দলিল হচ্ছে- যে ব্যক্তিকে একটি উট পায়ের নীচে চাপা দিয়ে মেরে ফেলেছে সে ব্যক্তি সম্পর্কে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী: “তাকে পানি ও বরই পাতা দিয়ে গোসল দাও। দুই কাপড়ে তাকে কাফন দাও। তার মাথা ঢাকবে না। তাকে হানুত দিবে না”। হানুত হচ্ছে- এক জাতীয় সুগন্ধির মিশ্রণ যা মৃত ব্যক্তির গায়ে লাগানো হয়।

৩. সহবাস করা: দলিল হচ্ছে আল্লাহর বাণী: “অর্থ- হজ্বের নির্দিষ্ট কয়েকটি মাস আছে। যে ব্যক্তি সেসব মাসে নিজের উপর হজ্ব অবধারিত করে নেয় সে হজ্বের সময় কোন যৌনাচার করবে না, কোন গুনাহ করবে না এবং ঝগড়া করবে না।”[সূরা বাকারা, আয়াত ২: ১৯৭]

৪. উত্তেজনাসহ স্ত্রীকে ছোঁয়া। যেহেতু এটি আল্লাহ তাআলার বাণী: فَلَا رَفَثَ (অর্থ- যৌনাচার নেই) এর অধীনে পড়বে। কারণ মুহরিম ব্যক্তির জন্য বিয়ে করা কিংবা বিয়ের প্রস্তাব দেয়া জায়েয নেই। সুতরাং ছোঁয়া জায়েয না হওয়াটা আরও স্বাভাবিক।

৫. কোন শিকার হত্যা করা। দলিল আল্লাহ তাআলার বাণী: “অর্থ- হে ঈমানদারগণ, তোমরা ইহরাম অবস্থায় শিকার বধ করো না”[সূরা মায়েদা, আয়াত: ৯৫] গাছ কর্তন করা মুহরিম ব্যক্তির জন্য হারাম নয়; তবে মক্কার হারামের সীমানার ভেতরের কোন গাছ হলে হারাম হবে এবং সেটি মুহরিম ব্যক্তি, মুহরিম নয় এমন ব্যক্তি- সবার জন্য হারাম। তাই আরাফার মাঠে মুহরিম ব্যক্তির জন্যেও গাছ উপড়ানো জায়েয। কারণ গাছ কর্তনের বিষয়টি হারাম এলাকার সাথে সম্পৃক্ত; ইহরামের সাথে নয়।

৬. ইহরাম অবস্থায় পুরুষের জন্য খাস নিষিদ্ধ বিষয়াবলীর মধ্যে রয়েছে- জামা, টুপি, পায়জামা, পাগড়ি ও মোজা পরিধান করা। দলিল হচ্ছে- নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে যখন জিজ্ঞেস করা হয়েছে মুহরিম কী পরিধান করবে; তখন তিনি বলেন: “মুহরিম ব্যক্তি জামা, টুপি, পায়জামা, পাগড়ি ও মোজা পরিধান করবে না। তবে যে ব্যক্তির পরার মত লুঙ্গি নেই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে পায়জামা পরার অনুমতি দিয়েছেন এবং যার জুতা নেই তাকে মোজা পরার অনুমতি দিয়েছেন।

আলেমগণ এ পাঁচটি পরিধেয়কে একত্রে ‘مخيط’ (মাখিত অর্থ- সেলাইকৃত) বলে থাকেন। অনেক সাধারণ মানুষ مخيط (সেলাইকৃত) বলতে যে পোশাকে خياطة (সেলাই) আছে সেটা বুঝে থাকে; আসলে বিষয়টি এমন নয়। বরং এর দ্বারা আলেমগণ উদ্দেশ্য করে থাকেন এমন পোশাক যা মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের অবয়ব অনুযায়ী কেটে তৈরী করা হয়েছে; যেমন- জামা, পায়জামা। এটাই তাদের উদ্দেশ্য। তাইতো কোন মুহরিম যদি তালি দেয়া চাদর পরিধান করে কিংবা তালি দেয়া লুঙ্গি পরিধান করে তাতে কোন অসুবিধা নেই। অথচ তিনি যদি সেলাইবিহীন জামা পরিধান করে সেটা হারাম হবে।

৭. ইহরাম অবস্থায় নারীদের জন্য খাস নিষিদ্ধ বিষয়াবলীর মধ্যে রয়েছে- নেকাব। নেকাব হচ্ছে এমনভাবে মুখ ঢাকা যাতে চোখ দুটো ছাড়া আর কিছু দেখা যায় না। অনুরূপভাবে স্কার্ফ পরাও নিষিদ্ধ। ইহরাম অবস্থায় নারীগণ নেকাব বা স্কার্ফ পরবে না। নারীর মুখ খোলা রাখা শরিয়তসঙ্গত। তবে বেগানা পুরুষের পাশ দিয়ে অতিক্রমকালে মুখ ঢেকে নিবে; যে কাপড় দিয়ে মুখ ঢাকবে সেটা যদি মুখ স্পর্শ করে তাতে কোন অসুবিধা নেই।

যে ব্যক্তি ভুলে গিয়ে, কিংবা অজ্ঞতাবশতঃ কিংবা জোরজবরদস্তির শিকার হয়ে এ নিষিদ্ধ কাজগুলোর কোনটিতে লিপ্ত হয় তাহলে তার উপর কোন দায় বর্তাবে না। দলিল হচ্ছে আল্লাহর বাণী: “কোন বিষয়ে তোমাদের বিচ্যুতি ঘটে গেলে তাতে কোন গুনাহ নেই, তবে আন্তরিক ইচ্ছাসহ হলে ভিন্ন কথা।[সূরা আহযাব, আয়াত: ৫] শিকার বধ করা ইহরাম অবস্থায় একটি নিষিদ্ধ কাজ; সে সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেছেন: “মুমিনগণ, তোমরা ইহরাম অবস্থায় শিকার বধ করো না। তোমাদেরমধ্যে যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে শিকার বধ করবেতার উপর বিনিময় ওয়াজিব হবে, যা সমান হবে ঐজন্তুরযে জন্তুকে সে বধ করেছে।”[সূরা মায়েদা, আয়াত: ৯৫] এ দলিলগুলো থেকে জানা যায় যে, যে ব্যক্তি ভুলক্রমে কিংবা অজ্ঞতাবশতঃ এ নিষিদ্ধ কাজগুলোতে লিপ্ত হবে তার উপর কোন দায় বর্তাবে না।

অনুরূপভাবে কাউকে যদি জবরদস্তি করে এর কোনটিকে লিপ্ত করানো হয় তার উপরও কোন দায় বর্তাবে না। দলিল হচ্ছে আল্লাহর বাণী: “যারা ঈমান আনার পর কুফরি করেছে; -তবে যাকে কুফরি করতে জবরদস্তি করা হয়েছে, অথচ তার অন্তর ঈমানে ভরপুর সে নয়- কিন্তু যে ব্যক্তি কুফুরির জন্য হৃদয়ের দুয়ার খুলে দিয়েছে; তাদের উপর আল্লাহর গযব; তাদের জন্যে রয়েছে মহা শাস্তি।”[সূরা নাহল, আয়াত: ১০৬] কাউকে জবরদস্তি করে কুফুরি করালে যদি এ বিধান হয় কুফুরির চেয়ে নিম্ন ক্ষেত্রে তো অবশ্য এ বিধান প্রযোজ্য।

তবে বিস্মৃত হয়ে যে ব্যক্তি কোন নিষিদ্ধ বিষয়ে লিপ্ত হয়েছে সে স্মরণ হওয়ার সাথে সাথে তা থেকে বিরত হবে। অনুরূপভাবে অজ্ঞ ব্যক্তি জানার সাথে সাথে নিষিদ্ধ বিষয় থেকে বিরত হওয়া তার উপর ফরজ। একইভাবে জোরজবরদস্তি থেকে মুক্ত হওয়ার সাথে সাথে সে ব্যক্তির নিষিদ্ধ বিষয় থেকে বিরত থাকা ফরজ। উদাহরণতঃ কোন মুহরিম যদি ভুলক্রমে মাথা ঢেকে ফেলে স্মরণ হওয়ার সাথে সাথে সে মাথা থেকে সে আবরণ দূর করবে। কেউ যদি সুগন্ধিযুক্ত কিছু দিয়ে তার হাত পরিস্কার করে স্মরণ হওয়ার সাথে সাথে হাত ধুয়ে সে সুগন্ধি দূর করা তার উপর ফরজ।

সূত্র: শাইখ উছাইমীনের ‘মানারু ইসলাম ফতোয়াসমগ্র’ খণ্ড-২, পৃষ্ঠা-৩৯১-৩৯৪

কোন মুহরিম ব্যক্তির জন্য ঘুমের সময় মাথা ঢাকা জায়েয আছে কিনা?

আলহামদুলিল্লাহ।

“যদি মুহরিম ব্যক্তি মহিলা হয় তাহলে তার জন্য মাথা ঢাকা জায়েয। আর যদি পুরুষ হয় তাহলে পুরুষের জন্য ঘুমের মধ্যে হোক কিংবা জাগ্রত অবস্থায় হোক মাথা ঢাকা জায়েয নেই। তবে তিনি যদি ঘুমের ঘোরে মাথা ঢেকে থাকেন, জাগ্রত হওয়ার সাথে সাথে কাপড় সরিয়ে নেয়া তার উপর ফরজ; কাপড় সরিয়ে নিলে তাকে কোন দণ্ড দিতে হবে না। কারণ ঘুমন্ত ব্যক্তি দায়মুক্ত।” সমাপ্ত

সূত্র: ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাব

কিছু লোক আছে যারা ইহরামকালে নিজের দেহে, মাথায় ও ইহরামের কাপড়ে সুগন্ধি লাগায়। এরপর সে কাপড় পরে ইহরাম করে। এর হুকুম কি?

আলহামদুলিল্লাহ।

মাথায় ও শরীরে সুগন্ধি লাগানো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নত। কিন্তু ইহরামের কাপড়ে সুগন্ধি লাগানো নাজায়েয। কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইহরামকারীকে এমন কাপড় পরিধান করতে নিষেধ করেছেন যে কাপড়ে সুগন্ধি লাগানো হয়েছে। শাইখ উছাইমীনকে ইহরামের কাপড়ে সুগন্ধি লাগানো সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন:

জায়েয নয়; কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “তোমরা এমন কাপড় পরিধান করো না যাতে জাফরান কিংবা ওয়ারস (একজাতীয় সুগন্ধি উদ্ভিদ) লাগানো হয়েছে”[সমাপ্ত]

শাইখ উছাইমীনের ফতোয়াসমগ্র (৯/২২)

সূত্র: ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাব